সম্প্রতি তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকার ইন্টারনেটভিত্তিক আইপিটিভি ও অনলাইন পোর্টালগুলোকে নীতিমালার আওতায় নিয়ে আসতে চায়। এই পদক্ষেপকে অনেকে স্বাগত জানালেও দীর্ঘমেয়াদে এটি সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

অনলাইন ভিত্তিক মিডিয়া সেন্ট্রিস্ট নেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও ইউনিভার্সিটি অব ডালাস-এর ফ্যাকাল্টি শাফকাত রাব্বি অনিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন: "আমি কোন বাংলাদেশী সরকারের মুখে মিডিয়া, হোক সেটা ছোট বড়, "নিয়ন্ত্রণের " কথা শুনলেই জানি এইটাতে ভালো কিছু হবে না।"

আন্দোলন-সংগ্রামে নাগরিক সাংবাদিকতা ও মোজোর শক্তি

ইন্টারনেট মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে গেছে যতদিনে, ততদিনে দেশে আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী সরকার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। সরকার এ সময়ে মোটাদাগে মূলধারার বেশিরভাগ গণমাধ্যমে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ফলে, বিভিন্ন আন্দোলনে সংগ্রাম দেশের বেশিরভাগ গণমাধ্যমের ভূমিকা ছিল বিটিভি’র ‘বাতাবিলেবুর বাম্বার ফলনের’ মতো। এমন সময়ে ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদমাধ্যমগুলো বিভিন্ন ছবি, ভিডিও এবং লাইভ সম্প্রচারের মাধ্যমে জনমত তৈরিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। 

উদাহরণস্বরূপ, জুলাই আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদের শহীদ হওয়ার অকাট্য প্রমাণ কোনো প্রথাগত টেলিভিশন ক্যামেরায় নয়, বরং মোজো সাংবাদিকের মোবাইল ফোনেই প্রথম উঠে আসে। এই একটি ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরো দেশের আন্দোলনের দৃশ্যপট পালটে দেয়। 

কেবল জুলাই আন্দোলন নয় ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনেও ছিল মোজোর ব্যপক ভুমিকা। ঢাকার ফুটপাথে বাসের দাঁড়িয়ে থাকা দুই শিক্ষার্থী বাস চাপায় নির্মম মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ার পর দেশজুড়ে নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের প্রথম দিকে মূলধারার টেলিভিশন চ্যানেলগুলো অঘোষিত সেলফ-সেন্সরশিপের কারণে মাঠের বাস্তব চিত্র সরাসরি সম্প্রচার থেকে অনেকটাই বিরত ছিল। তখন শিক্ষার্থীরা নিজেরাই মোবাইল হাতে নাগরিক সাংবাদিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তারা রাস্তায় লাইসেন্সবিহীন চালক (এমনকি পুলিশের গাড়ি ও উল্টোপথে চলা ভিআইপিদের গাড়ি) আটকানোর দৃশ্যগুলো ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে তুলে ধরে। 

এসময় ফেসবুক লাইভ করার অপরাধে অভিনেত্রী কাজী নওশাবাসহ একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারও করে তৎকালীন সরকার। 

এখানেই মোজো-র সবচেয়ে বড় শক্তি: এটি তথ্যের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভেঙে সাধারণ মানুষের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছে।

নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা এবং মুদ্রার উল্টোপিট

যদি বলা হয় ইন্টারনেটভিত্তিক গড়ে উঠা বিভিন্ন ধরনের সাংবাদিকতা প্রথাগত নিয়ম ভেঙে কেবল জনসাধারণের উপকারই করেছে, তা ভুল বলা হবে। এমন অনেকক্ষেত্রেই দেখা গেছে, ফেইক নিউজ ছড়ানো, নাগরিকের প্রাইভেসি লঙ্ঘনসহ নানা অনিভপ্রেত কাজ করেছে মোজো সাংবাদিকরা। ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারডিসমিসল্যাব এর মতে, ২০২৪ সালে মেটা প্ল্যাটফর্ম অর্থাৎ ফেসবুক, ইন্সটাগ্রামে প্রায় ৩ হাজারের অধিক গুঁজব ও ফেক নিউজ ছড়িয়েছে। অপরিণত ও অদক্ষ হাতের স্মার্টফোন অনেক সময়ই সাংবাদিকতার নামে অপসাংবাদিকতার জন্ম দিচ্ছে। দেশে অসংখ্য আইপিটিভি এবং পোর্টাল কোনো ধরনের সম্পাদকীয় 'গেটকিপিং' ছাড়াই সংবাদ প্রচার করছে। এর ফলে ফেইক নিউজ, গুজব এবং ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। 

“যেকোনো নীতিমালা হতে হবে গাইড করার জন্য। যদি তা না হয়ে ‘কন্ট্রোল’ করার উপায় হিসেবে ব্যবহার হয় তাহলে এ মাধ্যমে কোনো শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব হবে না।” 

-- ড খোরশেদ আলম
সহযোগী অধ্যাপক, ণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ভিউ-বাণিজ্যের যুগে অনেক তথাকথিত 'মোজো সাংবাদিক' রাস্তায়, বিপণিবিতানে বা ব্যক্তিগত পরিসরে সাধারণ মানুষের মুখের সামনে হঠাৎ বুম বা ক্যামেরা ধরে অপ্রস্তুত করা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছেন যা নিয়ে চরম অস্বস্তিতে পরেছেন ভুক্তভোগীরা।

শঙ্কার জায়গা: স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে অদৃশ্য বাধা

মনে করা হয়, যেকোনো ধরনের সাংবাদিকতার জন্য নীতিমালা করার উদ্দেশ্য শৃঙ্খলা বজায় রাখা। কিন্তু অতীতে বিভিন্ন সরকারের কর্মকাণ্ড ঘেঁটে দেখলে এই আশঙ্কা অমূলক নয় যে, নীতিমালার মারপ্যাঁচ সমালোচনা বা ভিন্নমত দমনের একটি প্রচ্ছন্ন হাতিয়ার। 

যখন কোনো নীতিমালায় 'রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি', 'অশোভন' বা 'জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি' শব্দগুলো সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত না করে ঢালাওভাবে ব্যবহার করা হয়, তখন সে ধরনের নীতিমালার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠাটাই স্বাভাবিক। এর ফলে সাংবাদিকরা 'সেলফ-সেন্সরশিপ' চর্চা করতে বাধ্য হন। একজন প্রতিবেদক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের আগে ভাবতে বাধ্য হন, এই খবরের কারণে পোর্টালের নিবন্ধন বাতিল হবে না তো?

অনলাইন সংবাদমাধ্যম বিষয়ক নীতিমালা প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড খোরশেদ আলম বলেন, “যেকোনো নীতিমালা হতে হবে গাইড করার জন্য। যদি তা না হয়ে ‘কন্ট্রোল’ করার উপায় হিসেবে ব্যবহার হয় তাহলে এ মাধ্যমে কোনো শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব হবে না।” 

তিনি আমাদের দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো অনলাইন ভিত্তিক সংবাদ প্রচার মাধ্যম গড়ে উঠার ব্যাপারটি তুলে ধরে বলেন, “সরকারকে পলিসি করতেই হবে।” এসব মাধ্যমে কাজ করা ‘সাংবাদিকদের’ সাংবাদিকতার জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। 

বিশ্বজুড়ে মোজো এবং অনলাইন পোর্টাল ব্যবস্থাপনা

বিশ্বের অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে কীভাবে অনলাইন গণমাধ্যম এবং মোজো ডিল করা হচ্ছে, তা এখানে প্রাসঙ্গিক। উন্নত দেশগুলোতে অনলাইন মিডিয়াকে সরাসরি সরকারি আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার চেয়ে সেলফ-রেগুলেশনের ওপর জোর দেওয়া হয়।

যেমন: যুক্তরাজ্যের 'ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রেস স্ট্যান্ডার্ডস অর্গানাইজেশন' (IPSO) ১,৫০০-এর বেশি প্রিন্ট ও অনলাইন পোর্টাল নিয়ন্ত্রণ করে সরকারের বাইরে থেকে। ২০২০ সালে সংস্থাটি ৩০,০০০-এর বেশি অভিযোগ পেয়েছিল — যার মাত্র ১.৭ শতাংশ তদন্তের আওতায় এসেছে। সমালোচকরা বলছেন, IPSO মূলত যে সংবাদপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার কথা, তাদের অর্থায়নেই চলে — ফলে স্বাধীনতার প্রশ্নটি থেকেই যায়। অর্থাৎ, সেলফ-রেগুলেশন মানেই নিরপেক্ষ নিয়ন্ত্রণ নয়।

তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে শীর্ষে থাকা নরওয়ের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। নরওয়ের অভিজ্ঞতা এখানে প্রাসঙ্গিক। দেশটির 'প্রেসেনস ফাগলিগে উৎভালগ' (PFU) ১৯২৮ সাল থেকে কার্যকর — সরকারের বাইরে, সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে। PFU-র স্বেচ্ছামূলক ব্যবস্থা এতটাই কার্যকর ছিল যে সমান্তরাল সরকারি কাঠামোর প্রয়োজন ছিল না বলে সরকার নিজেই মনে করেছিল। বর্তমানে PFU-তে সাতজন সদস্য থাকেন — দুজন সাংবাদিক, দুজন সম্পাদক এবং তিনজন সাধারণ নাগরিক — যারা দুই বছরের মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। যেকোনো নাগরিক বিনামূল্যে অভিযোগ দাখিল করতে পারেন এবং প্রতিটি অভিযোগকারী একটি সুস্পষ্ট জবাব পান। Reporters Without Borders-এর বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে নরওয়ে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।

তবে এই মডেলেও সীমাবদ্ধতা আছে। গবেষক সভেইন ব্রুরোস-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, PFU মূলত 'বিরক্তিকর ও বেপরোয়া' সাংবাদিকদের শাস্তি দেয়, কিন্তু 'সংকুচিত ও কাপুরুষোচিত' সাংবাদিকতাকে কখনো দোষী সাব্যস্ত করে না। অর্থাৎ সেলফ-রেগুলেশন সাহসী সাংবাদিকতা নিশ্চিত করে না — শুধু সীমা লঙ্ঘন ঠেকায়।

উত্তরণের উপায়: অভিজ্ঞতা কী বলছে?

স্বাধীন সাংবাদিকতা গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য — এ নিয়ে বিতর্ক নেই। বিতর্ক হচ্ছে পদ্ধতি নিয়ে। কেবল আইনি কাঠামো দিয়ে অপেশাদার সাংবাদিকতা ঠেকানো গেছে এমন নজির বিশ্বে কম। বরং, যেসব দেশে প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, সেখানে ফলাফল তুলনামূলকভাবে ভালো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. খোরশেদ আলম মনে করেন, সমস্যাটা একটি স্তরে সীমাবদ্ধ নয়। তাই সমাধানও একাধিক স্তরে খুঁজতে হবে।

স্বল্পমেয়াদে তিনি নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন — তবে সেই নীতিমালা কেমন হবে সেটা নিয়ে তার অবস্থান স্পষ্ট: "যেকোনো নীতিমালা হতে হবে গাইড করার জন্য। যদি তা না হয়ে 'কন্ট্রোল' করার উপায় হিসেবে ব্যবহার হয় তাহলে এ মাধ্যমে কোনো শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব হবে না।"

মধ্যমেয়াদে তিনি মিডিয়া লিটারেসির প্রশ্নটি সামনে আনেন। "অনলাইনের কোন খবর সত্যি, কোনটি ফেইক — তা বুঝতে না পারার পেছনে বড় কারণ মিডিয়া লিটারেসির অভাব।" এই ঘাটতি থাকলে নীতিমালা দিয়ে ফেইক নিউজ ঠেকানো যাবে না — কারণ চাহিদা থাকলে যোগানও থাকবে।

দীর্ঘমেয়াদে ড. আলম কাঠামোগত সমস্যার দিকে আঙুল তোলেন। "দেশে প্রচুর বেকার মানুষ আছে। তাদেরকে কাজের মধ্যে নিয়ে আসাসহ আরও যেসব সমস্যা আছে বেসিক স্ট্রাকচারে — সেসব ঠিক করতে মনোযোগ দিতে হবে।" অর্থাৎ, অপসাংবাদিকতার শিকড় শুধু সাংবাদিকতায় নয় — বরং বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক চাপও মানুষকে অপেশাদার মিডিয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

মোবাইল ও ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আজকের বাস্তবতা। প্রশ্ন হচ্ছে — বাংলাদেশ এই বাস্তবতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে, নাকি উন্নয়ন করতে?

Tagged in:

Analysis

Last Update: March 19, 2026