বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ও নিরাপদ অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম বা ডিজিটাল ওয়ালেট হলো পেপ্যাল। এটি একটি আমেরিকান বহুজাতিক কোম্পানি যা প্রযুক্তির মাধ্যমে ২০০টির বেশি দেশে ২৫টিরও বেশি মুদ্রায় ইন্টারনেটে দ্রুত অর্থ আদান-প্রদান, কেনাকাটা এবং পেমেন্ট সুবিধা প্রদান করে। যদিও বাংলাদেশে পেপ্যাল চালু করার প্রতিশ্রুতি অনেক পুরোনো, তবে গত ২২ এপ্রিল জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারের মাধ্যমে বড় পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বহুল প্রতীক্ষিত অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে পেপ্যাল চালুর কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করার লক্ষ্যে একটি কার্যকর কমিটি গ্রহণ করা হয়েছে।

পেপ্যাল বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করবে—এমন আলোচনা ও প্রতিশ্রুতি বিভিন্ন সময়ে এলেও তা এখনো দীর্ঘসূত্রিতা এবং বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কারণে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে চালুর বিষয়টি ফ্রিল্যান্সারদের কাছে হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে, ২০১৭ সালে একটি নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা  করা হলেও পরবর্তীতে তা স্থগিত হয়ে যায়। এর পরেও পেপ্যাল চালু করা নিয়ে বহুবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও আজ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি।

পেপ্যাল চালু হলে কি সুবিধা হবে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, যাদের নিয়মিত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থ আদান-প্রদান করতে হয়, তাদের জন্য এই প্ল্যাটফর্মটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করবে। বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সার এবং ছোট পরিসরের ব্যবসায়ীরাই এর মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন। বিডি জবসের প্রধান নির্বাহী ও বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর বলেছেন, "বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের অনেকে টাকা রিসিভ করতে পারেন না। কারণ অনেক বিদেশি ক্লায়েন্ট পেপ্যালের মাধ্যমে পেমেন্ট করতে চায়, যেহেতু পেপ্যালের মাধ্যমে করলে তার কিছু সিকিউরিটি আছে।" তার মতে, "পেপ্যালে ইন্স্যুরেন্স আছে। কোনো কারণে যদি সমস্যা হয়, পেপ্যাল তাকে টাকা ফেরত দেয়। এখন পেপ্যাল এলে ফ্রিল্যান্সারদের সুবিধা হবে।"

বাংলাদেশে ভ্রমণরত বা কর্মরত বিদেশিরা অনেক সময় প্রচলিত ক্রেডিট কার্ডের বদলে পেপ্যালের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করতে পছন্দ করেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক ই-কমার্স থেকে দেশি পণ্য কেনার ক্ষেত্রেও এটি তাদের কাছে প্রধান মাধ্যম হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং ব্যক্তি পর্যায়ে বিশ্বজুড়ে পণ্য বেচাকেনার ক্ষেত্রে পেপ্যাল লেনদেনকে অনেক বেশি সহজতর করবে। একইসঙ্গে, প্রবাসীরা এর মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুত ও স্বল্প সময়ে বাংলাদেশে অর্থ পাঠাতে পারবেন। বিশেষ করে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফি পরিশোধে যে ধরনের প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতা দেখা দেয়, পেপ্যাল চালু হলে শিক্ষার্থীরা সেই ঝামেলা থেকে মুক্তি পাবেন। মূলত আন্তর্জাতিক লেনদেনের প্রতিটি স্তরেই এটি একটি গতিশীল সমাধান হিসেবে কাজ করবে।

পেপ্যাল চালু হওয়ার সম্ভাবনা ও যৌক্তিকতা:

বাংলাদেশে পেপ্যাল আসার সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চললেও বাস্তবক্ষেত্রে এর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। মূলত সরকারি পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট রূপরেখার অভাব এবং নীতিগত জটিলতার কারণে এই পেপ্যাল চালুর বিষয়টি এখনো ধোঁয়াশায় রয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।

ঢাকার ফ্রিল্যান্সার তৌহিদুর রহমান প্রথম আলোর কাছে বাংলাদেশে পেপ্যাল আসার দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং অন্তরায় নিয়ে বলেছেন, ‘আমরা তো অনেক বছর ধরেই শুনে আসছি পেপ্যাল আসবে। পরে দেখেছি এটা আসে না। কারণ, পেপ্যালের সদর দপ্তরে যখন যোগাযোগ করা হয়, তখন তারা ভারতকেই দেখতে বলে। আর পেপ্যালের এই জায়গাটায় ভারতের লোকজন বসে আছে। যার কারণে না আসার একটা কারণ হতে পারে। এখন পেপ্যাল কতটুকু আসবে, বাংলাদেশে এটা ধোঁয়াশাই। তবে পেপ্যাল আসলে বাংলাদেশে আমাদের মতো ফ্রিল্যান্সারদের একটা বড় চাওয়া পূরণ হবে।’

ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম আপওয়ার্কের শীর্ষস্থানীয় ফ্রিল্যান্সার কাজী মামুন প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশে পেপ্যাল চালুর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাবকে দায়ী করে বলেছেন, ‘পেপ্যালের আসা নিয়ে অনেক কথা হলেও, বাস্তবে আমরা এর কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা এখনো পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি না। একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে পেপ্যালের ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যাংক নীতি সংস্কারের উদ্যোগ এখনো নেওয়া হয়নি। স্টারলিংকের ক্ষেত্রে আমরা যেমন দ্রুত অগ্রগতি দেখেছি, পেপ্যালের ক্ষেত্রে তা অনুপস্থিত।’ কিন্তু দীর্ঘসূত্রিতার প্রকৃত কারণ এবং নেপথ্যের প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্য নেই। এই বিষয়ে ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম 'কাজ৩৬০'–এর প্রতিষ্ঠাতা এমরাজিনা ইসলাম দেশে পেপ্যাল সেবা চালুর অনিশ্চয়তা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন,  ‘আসলে পেপ্যাল কবে আসবে, এটা আমরাও জানি না। কোনো এক জাগায় সমস্যা আছে। সমস্যাটা কারা তৈরি করছে, এটা আমরা বুঝতে পারছি না। সরকারের তরফ থেকেও জানানো হচ্ছে না যে কেন পেপ্যাল চালু হচ্ছে না।’

এদিকে Business Globalizer বাংলাদেশে পেপ্যাল না আসার পেছনে প্রধান দুটি কাঠামোগত জটিলতার কথা উল্লেখ করেছে। প্রথম ও প্রধান বাধা হলো স্বয়ংক্রিয় ব্যবহারকারী যাচাইকরণ বা অটোমেটেড ইউজার অথেন্টিকেশন ব্যবস্থা না থাকা। পেপ্যালের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য প্রতিটি ব্যবহারকারীর সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি এবং এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় হতে হয়। যদিও বাংলাদেশে এনআইডি (NID) বা পাসপোর্ট ডাটাবেজ ব্যবহার করে এটি করা সম্ভব এবং বিকাশ-এর মতো কিছু প্রতিষ্ঠান এ নিয়ে কাজ করছে, তবুও জাতীয় পর্যায়ে রিয়েল-টাইম বা তাৎক্ষণিক ভেরিফিকেশন সিস্টেম এখনো পেপ্যালের বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রস্তুত নয়।

দ্বিতীয় সমস্যাটি হলো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় 'ডিরেক্ট ডেবিট' সুবিধা না থাকা। পেপ্যালের নীতি অনুযায়ী, কোনো লেনদেন নিয়ে বিবাদ সৃষ্টি হলে বা গ্রাহক টাকা ফেরত চাইলে পেপ্যালকে সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে সরাসরি অর্থ ফিরিয়ে নেওয়ার (রিকভারি) ক্ষমতা দিতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রচলিত ব্যাংকিং আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী ব্যাংকগুলো পেপ্যালকে গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে সরাসরি টাকা নেওয়ার এই অনুমতি দেয় না। মূলত এই আইনি জটিলতা এবং অর্থ পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে ঝুঁকির কারণেই পেপ্যাল বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম শুরু করতে পারছে না।

সিইও (CEO) পরিবর্তন নতুন কৌশলের বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং Apple Pay, Google Pay, এবং Visa/Mastercard-এর মত বড় কোম্পানিগুলোর সাথে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে ২০২৫ সালে পেপ্যাল ব্যবহার করে অনলাইন কেনাকাটার পরিমাণ (branded checkout growth) কমে মাত্র ১%-এ নেমে এসেছে যার ফলশ্রুতিতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে, চতুর্থ প্রান্তিকের আয়ের প্রতিবেদন প্রকাশের পর পেপ্যালের শেয়ারের দাম প্রায় ১৮% থেকে ২০% পর্যন্ত কমেছে, যা ২০২২ সালের পর থেকে সবচেয়ে বড় ক্ষতি। ২০২৪ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত, পেপ্যালের শেয়ারের দাম প্রায় ২২% হ্রাস পেয়েছে।নতুন সিইও অ্যালেক্স ক্রস জানিয়েছেন, ২০২৬ সালে কোম্পানিটি তাদের সেবার মান এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। এই অবস্থায় বিশ্লেষকদের মতে শেয়ারের দাম এবং মুনাফা ঠিক রাখতে কোম্পানিগুলো সাধারণত খরচ কমানোর পথ বেছে নেয়। ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে পেপাল হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। ২০২৬ সালেও যদি পরিস্থিতির উন্নতি না হয় তাহলে সেবার ওপর বিভিন্ন নতুন ফি বা চার্জ আরোপসহ তাদের ফিন্যান্সিয়াল প্রোডাক্টগুলোতে (যেমন: পেপাল ক্রেডিট বা লোন) সুদের হার বাড়িয়ে দিতে পারে ফলে অনেক গ্রাহক পেপ্যালের বিকল্প পেমেন্ট সিস্টেমের দিকে ঝুকতে পারে। বৈশ্বিক বাজারে পেপ্যালের শেয়ারের দরপতন, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং মুনাফা অর্জনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে এই সেবাটি চালু হলেও স্থানীয় ফ্রিল্যান্সার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা কতটুকু সুফল পাবেন এবং পেপ্যালের স্থায়ীত্ব নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।

সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশে পেপ্যাল চালুর বিষয়টি একদিকে যেমন অপার সম্ভাবনার, অন্যদিকে তেমনি বহুবিধ চ্যালেঞ্জে ঘেরা। এখন দেখার বিষয় সার্বিক জটিলতা কাটিয়ে সরকার দ্রুততার সাথে এই পেপ্যাল চালু করতে সক্ষম হবে কি না।

 

 

 

 

Tagged in:

Analysis

Last Update: May 12, 2026