২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যের ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯০ লক্ষেরও বেশি(যা রাজ্যের মোট ভোটারের প্রায় ১২%)-ভোটারের নাম বাদ পড়া নিয়ে চরম বিতর্ক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI) কর্তৃক পরিচালিত 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' (SIR) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই নামগুলি বাদ দেওয়া হয়েছে, যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মৃত, দ্বৈত (Duplicate), স্থানান্তরিত ও অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ভোটার তালিকা থেকে সরানো। তবে, এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ও নথিপত্রধারী অর্থাৎ প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকদের অনেক নামও তালিকা থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও তথ্য বিশ্লেষণে মোট বাদ প্রায় ৯১ লক্ষ ভোটারের মধ্যে ৬৩% (প্রায় ৫৭ লক্ষ) হিন্দু ধর্মাবলম্বী ও ৩৪% (প্রায় ৩১ লক্ষ)মুসলিম সম্প্রদায়। যদিও সংখ্যায় এটি হিন্দুদের চেয়ে কম, কিন্তু বিতর্কের কারণ হলো আনুপাতিক হার। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ২৭%, অথচ ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ পড়ার হার (৩৪%) সেই জনসংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ যাকে অনেক বিশ্লেষক রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সমালোচনা করছেন।
যেভাবে একটি সফটওয়্যার লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিল:
এই কাজটি করা হয়েছে একটি স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার (De-duplication Software) এর মাধ্যমে যা ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সাথে বর্তমান তালিকার তুলনা করে যেখানেই সামান্যতম অমিল পাওয়া গেছে, সেখানেই সেই ভোটারকে ASSD' (Absent, Shifted, Suspected, Dead) বা 'সন্দেহভাজন' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে যার মাধ্যমে ‘তথ্যগত অসংগতি’ বা ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি’ তালিকাভুক্ত করে লাখো ভোটারের নাম তালিকা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। অথচ একই যাচাই-প্রক্রিয়াটি এর আগে যে অন্যান্য রাজ্যসভা নির্বাচনগুলো হয়েছে সেখানে কোথাও অনুসরণ করা হয়নি।
কিন্তু ‘দ্যা রিপর্টার্স কালেক্টিভ' যখন এই বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান চালায়, তখন দেখা যায় যে সফটওয়্যারটি ব্যবহারের আগে কোনো পরীক্ষামূলক যাচাই বা 'টেস্টিং' করা হয়নি। নির্বাচন কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, প্রতি ৬০টি রেকর্ডের মধ্যে ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই সফটওয়্যারটি ভুল তথ্য সংগ্রহ করেছিল। অর্থাৎ লক্ষ-লক্ষ মানুষের ভোটাধিকারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে এমন একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে, যার নির্ভুলতা সম্পর্কে খোদ নির্বাচন কমিশনেরই কোনো ধারণা নেই। কোনো মাঠপর্যায়ের তদন্ত ছাড়াই একটি 'অ্যালগরিদম' ঠিক করে দেয় কে ভারতীয় আর কে নয়। নির্বাচন কমিশনের এই খামখেয়ালিপনার কারণে আজ লক্ষ লক্ষ ভোটার হাতে নথিপত্র নিয়ে ট্রাইব্যুনালের বাইরে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন—কেবল এই কারণে যে, একটি মেশিন তাদের নামের বানান ভুলভাবে পড়েছে।
তালিকা থেকে কাদের বাদ দেওয়া হয়েছে?
এই তালিকাটি অনেক দীর্ঘ। বিশ্বকাপ জয়ী মহিলা ক্রিকেটার রিচা ঘোষ, বাংলার প্রথম মহিলা মুখ্য সচিব নন্দিনী চক্রবর্তী, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দুই মন্ত্রী শশী পাঁজা ও মুহাম্মদ গোলাম রব্বানী, বাংলার নবাব মীর জাফরের বংশধর, সৈয়দ রেজা আলী মির্জা এবং তাঁর ছেলে ফাহিম—তাঁদের নামও 'সন্দেহভাজন ভোটার' তালিকায় রাখা হয়েছে। শুধু তাই নয়, তালিকায় রয়েছেন বহু ডাক্তার, আইনজীবী এমনকি পুলিশ কর্মকর্তা। এমনকি যারা সরেজমিনে তদন্ত (SIR) চালাচ্ছিলেন, সেই বুথ লেভেলের অফিসারদের নামও সন্দেহভাজন বিভাগে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
যাঁরা নিজেদের জীবন ভারতীয় রাষ্ট্রের সেবায় উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের অনেকেই হঠাৎ করে ভোটাধিকারচ্যুত হয়েছেন। বাষট্টি বছর বয়সী সেনারুল হক, যিনি ৩৫ বছর চাকরি করার পর দুই বছর আগে ভারতের আধাসামরিক বাহিনী সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স থেকে অবসর নিয়েছেন, তিনি দেখেন যে ভোটার তালিকা থেকে তাঁর নাম উধাও, অথচ তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলের নাম তালিকায় রয়ে গেছে। তিনি বলেন “এটা অত্যন্ত হতাশাজনক। আমি দেশের সবচেয়ে কঠিন কিছু এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছি। এরপর যখন ভোটার তালিকা থেকে আমার নাম বাদ পড়ল, আমি যথাযথভাবে আমার কাগজপত্র জমা দিয়েছি, তারপরেও আমার নাম নেই।" তিনি আরও বলেছেন, “আমি সারাদেশে নির্বাচনী দায়িত্বে ছিলাম। এখন আমাকে ভোট দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, এবং এর জন্য কেউ জবাবদিহি করছে না। এটাকে উপহাস বলে মনে হচ্ছে। নির্বাচনের ঠিক আগে কীভাবে এত মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে মুছে ফেলা যায়?”
কারগিল যুদ্ধের সৈনিক মুহাম্মদ দুয়াল আলী, যিনি দেশের জন্য বুলেট বিদ্ধ হয়েছিলেন, নিজের সেনাবাহিনীর নথিপত্র এবং সার্ভিস রেকর্ড প্রমাণ হিসেবে দেখানোর পরেও নির্বাচন কমিশনের সফটওয়্যার তাকে 'সন্দেহভাজন ভোটার' (D-Voter) তালিকায় ফেলে দিয়েছে।
৩৬ বছর বয়সী জাবের আলী, যিনি ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য নথি সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের একজন বলেন “গ্রামে এখন আতঙ্ক বিরাজ করছে, কারণ আজীবন ভারতীয় নাগরিকরা আশঙ্কা করছেন যে তাঁদেরকে বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসী হিসেবে গণ্য করে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে। তিনি বিশ্বাস করেন যে তাঁর এলাকায় এই বাদ দেওয়ার ঘটনাটি একটি নির্দিষ্ট ধরন অনুসরণ করেছে। তিনি বলেন, “এখান থেকে যাদেরকে সরানো হয়েছে, তাঁরা সবাই মুসলমান। মানুষ মনে করছে যে তাঁদেরকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে এবং তাঁদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।”
কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শহীদুল্লাহ মুন্সি—যিনি বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ ওয়াকফ বোর্ডের চেয়ারম্যান—তাঁর নামও ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল এবং তাঁর স্ত্রী ও ছেলেকে 'সন্দেহভাজন' বিভাগে রাখা হয়েছিল। তিনি বিষয়টিকে অত্যন্ত অপমানজনক এবং বেদনাদায়ক বলে বর্ণনা করেছেন। পরবর্তীতে যখন এই ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমের নজরে আসে, তখন রাতারাতি তাঁর নাম আবার তালিকায় ফিরিয়ে আনা হয়।
কিন্তু ভোটার তালিকা থেকে এমন বাদ পড়ার কারণ কি?
নির্বাচন কমিশন এই সন্দেহভাজন ভোটারদের নাম জনসমক্ষে প্রকাশ করতে একেবারেই অস্বীকার করেছিল, কিন্তু পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের কড়া নির্দেশে তারা এটি প্রকাশ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় নির্বাচন কমিশন কেন এই তথ্য গোপন রাখতে চেয়েছিল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে পরিসংখ্যানে। নিউজ পোর্টাল ‘Article 14’-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, সন্দেহভাজন ভোটারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি এমন ১০টি জেলার মধ্যে ৯টি জেলাতেই মুসলিম ভোটার ৫০% বা তার বেশি। যেমন মুর্শিদাবাদে, যেখানে ৬৬% মুসলিম জনসংখ্যা, সেখানে সর্বোচ্চ ১১ লক্ষ ভোটারকে এই তালিকায় ফেলা হয়েছে। একই তথ্যসূত্রে কলকাতা পোর্টে ৫০% মুসলিম ভোটার থাকলেও সন্দেহভাজন তালিকায় তাঁদের হার ৮২%, মেটিয়াব্রুজে ৬০% মুসলিমের বিপরীতে তালিকায় তাঁদের হার ৮৭%, এমনকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কেন্দ্র ভবানীপুরে ২০% মুসলিম ভোটার হওয়া সত্ত্বেও সন্দেহভাজন তালিকায় তাঁদের হার ৫২%।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম 'The Wire’-এর তদন্তে আরও দেখা যায় যে, রানিনগর কেন্দ্রের হিন্দু প্রধান বুথগুলোতে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার হার মাত্র ৩% কিন্তু মুসলিম প্রধান বুথগুলোতে সেই সংখ্যা ৩৫% থেকে ৫৮% পর্যন্ত। একই নির্বাচনী এলাকা ও একই সফটওয়্যার ব্যবহার করে এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় এই বিশাল ব্যবধানকে কেন্দ্র করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ তুলেছেন যে, এই কারচুপির মাধ্যমে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ দখলের চেষ্টা করছে, এবং এটিকে তিনি একটি 'অঘোষিত জরুরি অবস্থা' বলেছেন।
নরেন্দ্র মোদি সরকার বাদ দেওয়ার এই প্রক্রিয়াকে “অনুপ্রবেশকারী” (যা মূলত অবৈধ বাংলাদেশি মুসলিম অভিবাসীদের) ভোটদান বন্ধ করার প্রক্রিয়া বলে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করলেও বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস মনে করে এটি বিজেপির গত ১৫ বছর ধরে তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) কাছ থেকে ক্ষমতা দখলের চেষ্টার অংশ। বিজেপি ভারতের বেশিরভাগ রাজ্যে বিজেপি তাদের প্রভাব বিস্তার করতে পারলেও, পশ্চিমবঙ্গে তারা এখনও শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে পারেনি। এর একটি বড় কারণ হলো রাজ্যের উল্লেখযোগ্য মুসলিম জনগোষ্ঠীর সমর্থনের অভাব, যারা তাদের হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে সতর্ক। কিছু মুসলিম-অধ্যুষিত আসনে প্রায় অর্ধেক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে যাদের বেশিরভাগর কাছে প্রমাণ রয়েছে যে তারা জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিক এবং তারা নিজে অথবা তাদের বাবা-মা বিগত ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তাই ভোটার তালিকা থেকে ভোটারদের অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বাদ দেওয়া রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে তৃণমূল কংগ্রেস মনে করে। এই সম্পর্কে মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, "এতগুলো ভোটারের সমস্যা সমাধান না করে কিভাবে নির্বাচন হবে?"
“বাংলায় যা ঘটেছে তা একটি সাংবিধানিক অপরাধ। এটি ভারতের জনগণের বিরুদ্ধে, বাংলার জনগণের বিরুদ্ধে একটি অপরাধ। স্বাধীনোত্তর ভারতের ইতিহাসে এটি একটি কেলেঙ্কারি হিসেবে লিপিবদ্ধ থাকবে। এক ব্যক্তি, এক ভোট সংবিধান কর্তৃক ভারতীয় জনগণকে প্রদত্ত একটি মহান অধিকার। আপনি যতই দরিদ্র বা অসহায় হোন না কেন, আপনার ভোট দেওয়ার সেই অধিকার রয়েছে। কিন্তু তা কেড়ে নেওয়া হয়েছে।”
- সাগরিকা ঘোষ, তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য
সুপ্রিম কোর্ট কি বলছে?
এই পরিস্থিতিতে, ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি বিশেষ নির্দেশনায় বলা হয়েছে যে সমস্ত ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে এবং যারা ট্রাইব্যুনালে আপিল করেছেন, তাদের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক অনুমোদিত ব্যক্তিরা ভোট দিতে পারবেন। এই নির্দেশ অনুযায়ী, প্রথম দফার ভোটের (২৩ এপ্রিল ২০২৬) আগে ট্রাইব্যুনাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়া মাত্র ১৩৯ জন ভোটার ভোটার তালিকায় পুনরায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন, যা মোট বাদ পড়া ভোটারের তুলনায় খুবই নগণ্য। অভিযোগ উঠেছে, ৬০ লক্ষাধিক ভোটারের নাম বিবেচনাধীন (adjudication) থাকলেও, দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও ট্রাইব্যুনালের ধীর গতির কারণে মাত্র ১৩৯ জন ভোটার প্রথম দফার নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। অর্থাৎ, নাম বাদ পড়া ৯১ লক্ষ ভোটারের সিংহভাগই তাদের সাংবিধানিক ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি, যা গণতন্ত্রের জন্য এক বড় ধাক্কা বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। যদিও সুপ্রিম কোর্ট ভোট দেওয়ার সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু দীর্ঘসূত্রিতা এবং ট্রাইব্যুনালে আবেদনের জটিলতার কারণে লক্ষ লক্ষ যোগ্য নাগরিক, বিশেষ করে সং্খ্যালঘু মুসলিম যারা আগে নিয়মিত ভোট দিয়েছেন, এবার ভোট দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
