২৫ অক্টোবর, রোববার বিকেলে ময়মনসিংহের ভালুকায় নিজের বিউটি পার্লার থেকে ফেসবুকে লাইভে আসেন ১৪ বছর ধরে ব্যবসা করা সাথী আক্তার। লাইভের একপর্যায়ে বলেন, ‘বিএনপি সরকারকে ভোট দিয়া আজকে ভুক্তভোগী।’ (দ্য ডেইলি স্টার (আর্কাইভ)) কারণ সেদিন সকালে তাঁর দুটি শোরুমের বৈদ্যুতিক তার কেটে নিয়ে যায় চোরেরা; আগের মাসেও চুরি গিয়েছিল একটি এয়ার কন্ডিশনারের তার।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাঁর দোকানের সামনে জড়ো হন স্থানীয় বিএনপির কর্মীরা। ভালুকা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক দ্য ডেইলি স্টারকে (আর্কাইভ) বলেন, তাঁর কথায় দলীয় কর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। এরপর রাত সাড়ে আটটার দিকে পুলিশ তাঁকে থানায় নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে। পরদিন বিকেলে ময়মনসিংহের একজন ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারায় কারাগারে পাঠান। এই ধারায় পুলিশ অপরাধ ঘটার আগেই কাউকে আটক করতে পারে। কিন্তু সাথী আক্তারের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দায়ের হয়নি। ভালুকা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিজেই বলেছেন, তাঁর কথায় রাষ্ট্রবিরোধী কিছু ছিল না। তিনি প্রথম আলোকে (আর্কাইভ) বলেন, পুরো ভিডিওটি চারবার দেখে সরকারবিরোধী বা সরকারের সমালোচনামূলক কিছু পাননি। তবে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর সঙ্গে কথা বলতে আসা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সাথী আক্রমণাত্মক আচরণ করেছিলেন, এ কারণে তাঁকে আটক করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তাঁর পরিবার, মন্ত্রী-সংসদ সদস্য বা সরকারের সমালোচনা, বিদ্রূপ কিংবা অপমানের অভিযোগে ফেব্রুয়ারি থেকে গ্রেপ্তার হওয়া অন্তত ৩০ জনের একজন সাথী আক্তার; ৩০টি আলাদা ঘটনায় তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই হিসাব করেছে দ্য ঢাকা। আমরা ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত প্রায় ৮৫০টি সংবাদ প্রতিবেদন পড়েছি, প্রতিটি ঘটনায় জামিন, কারাবাস বা মুক্তির খবর খুঁজেছি, এবং বিএনপি সরকারের প্রথম আট মাসকে তুলনা করেছি তার আগের ১৮ মাসের, অর্থাৎ মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের সঙ্গে। আমাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে:

  • সরকারের সমালোচকদের গ্রেপ্তার প্রায় শূন্য থেকে নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে: ১৮ মাসে ইউনূস বা তাঁর সরকারের সমালোচনার অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকার দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছিল, আর তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল, তবে গ্রেপ্তার করা হয়নি। বিএনপি সরকার আট মাসে ৩০টি আলাদা ঘটনায় ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে— হিসেবে যা সপ্তাহে প্রায় একজন।
  • অভিযোগ দায়ের করছে ক্ষমতাসীন দল: ফেব্রুয়ারি থেকে বিএনপি বা সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার বা মামলার শিকার ৫০ জনের মধ্যে অন্তত ১৮ জনের ক্ষেত্রে অভিযোগকারী ছিলেন বিএনপির কোনো নেতা, কিংবা দলের অঙ্গসংগঠন যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল বা ছাত্রদলের কেউ। অন্তত ১০টি ঘটনায় দলীয় কর্মীরা ওই ব্যক্তিকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন।
  • কথা অপরাধ না হলে পুলিশ অন্য অভিযোগ খুঁজে নিচ্ছে: প্রধানমন্ত্রীর অন্তত সাতজন সমালোচককে পোস্টের জন্য তুলে নিয়ে পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইন বা ভাঙচুরের পুরোনো ও সম্পর্কহীন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি মামলা ছিল আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড ঘিরে।
  • বিএনপি ক্ষমতায় আসার আগেই এই কাজ শুরু হয়েছিল: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অর্থাৎ বিএনপি যখন সরকার গঠন করেনি, তখনও দলীয় নেতাদের অপমানের অভিযোগে মানুষকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছিল এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটা হয়েছিল বিএনপি কর্মীদের অভিযোগ বা ধরিয়ে দেওয়ার পর।

সরকার বা ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের নিয়ে বলা কথার জন্য গ্রেপ্তার ও মামলার হিসাব আমরা করেছি। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের জন্য করা মামলা আলাদা বিষয়; সেগুলো এই হিসাবে আসেনি। তবে কাউকে সমালোচনার কারণে তুলে নিয়ে পরে কেবল দলীয় মামলায় আসামি করা হলে সেটি হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করেছি। এর মধ্যে অন্তত একবার প্রধানমন্ত্রী আটককৃত এক সমালোচককে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তারপরও গ্রেপ্তার থামেনি।

১৮ মাসে দুইজন, তারপর প্রতি সপ্তাহে একজন

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সরকারের সমালোচনার অভিযোগে গ্রেপ্তার ছিল বিরল। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে কুড়িগ্রামে পুলিশ এক যুবলীগ সদস্যকে প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস ও জাতীয় সংগীতকে বিদ্রূপ করে টিকটক ভিডিও বানানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। নভেম্বরে পার্বতীপুরে পুলিশ এক স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেত্রীকে ‘ইউনূস হটাও, বাংলাদেশ বাঁচাও’ স্লোগানসহ টিকটক ভিডিওর জন্য আটক করে। এছাড়া প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসকে নিয়ে মন্তব্যের কারণে আরও তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল, কিন্তু কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। যেমন কলাপাড়ায় প্রধান উপদেষ্টাকে ‘আমেরিকার দালাল’ বলায় এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়েছিল—যে মামলা নিয়ে তখনই প্রশ্ন তুলেছিল বিবিসি বাংলা (আর্কাইভ)।

অর্থাৎ ৫৫৮ দিনে দুটি গ্রেপ্তার হয়েছিল। এদিকে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার শপথ নেওয়ার পর ২৫২ দিনে গ্রেপ্তার হয়েছে ৩০ জন।

সরকার দায়িত্বে স্থায়ী হওয়ার পরও গ্রেপ্তারের গতি কমেনি। প্রধানমন্ত্রীর সমালোচকদের গ্রেপ্তারের জন্য ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর ছিল এখন পর্যন্ত সবচেয়ে খারাপ মাস। গাজীপুরে কলেজছাত্র সিফাত আব্দুল্লাহ বিদ্যুৎ বিল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে গালাগাল করে একটি ভিডিও পোস্ট করেন (আর্কাইভ)। অবশ্য পরে পল্লী বিদ্যুৎ বোর্ড বিলে কোনো অনিয়ম পায়নি (আর্কাইভ)। তবে সিফাতের জামিনের আবেদন দুবার নাকচ হয়। গাইবান্ধায় ২১ বছর বয়সী হুমায়ুন কবির ডিউককে নতুন সাইবার আইন, সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর অধীনে কারাগারে পাঠানো হয় (আর্কাইভ)। এই আইনটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশের বদলে করা হয়েছে। মৌলভীবাজারে জুলাই রাজবন্দি অ্যালায়েন্সের নেতা বাবুল মিয়াকে স্থানীয় বিএনপি সংসদ সদস্যের পক্ষে দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয়; তার "অপরাধ" তিনি সংসদ সদস্যের সমালোচনা করে পোস্ট দিয়েছিলেন। রাজশাহীতে প্রধানমন্ত্রীর বাসের ছবির নিচে আবু বকর সিদ্দিক লেখেন, ‘শুধু একটা স্নাইপারের অভাব ছিল’। এজন্য সন্ত্রাসবিরোধী আইনে তাঁকে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। আদালতে তিনি বলেন, এটি ছিল কৌতুক। মন্তব্যটি হুমকি হিসেবেও পড়া যায়, তাই তাঁর ঘটনাটিকে আমরা সংশয়পূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছি এবং মূল হিসাব থেকে বাদ রেখেছি।

বাদী ক্ষমতাসীন দল

২০২৫ সালের সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে একটি রক্ষাকবচ আছে: অনলাইনের কোনো কনটেন্টে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তাঁর মনোনীত প্রতিনিধিই কেবল অভিযোগ করতে পারবেন। অন্তর্বর্তী সরকার এই বিধান যোগ করেছিল। এপ্রিলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছিল (আর্কাইভ), নিয়মটি ‘লঙ্ঘিত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে’। কীভাবে হয়েছে তা নথিতেই দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রী নিজে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করেননি। বরং তাঁর দলের স্থানীয় নেতারাই তা করেছেন।

২৬ মার্চ মুক্তাগাছায় জামায়াত-সমর্থক ৩৫ বছর বয়সী আজিজুল হক প্রধানমন্ত্রীর পাশে অর্ধনগ্ন এক নারীর ছবি জুড়ে সম্পাদিত একটি ছবি শেয়ার করেন। সেদিন রাতে স্থানীয় বাজারে প্রতিবাদ করেন বিএনপির কর্মীরা। রাত দেড়টার দিকে পুলিশ তাঁকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় ধরে নিয়ে যায়। পরদিন ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক সাইবার অধ্যাদেশ ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করেন (আর্কাইভ)। তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেই মামলা করেছি।’ আবার, দেবীগঞ্জে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতা মামলা করেন শাকিল আহমেদের বিরুদ্ধে; অভিযোগ, এআই দিয়ে বানানো এক ছবিতে শাকিলের পাশে প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে জাইমা রহমানকে দেখানো হয়েছিল। স্থানীয় সংসদ সদস্যকে নিয়ে রসিকতার জন্য ১৬ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করেন যুবদলের এক নেতা। দুটি ঘটনাই প্রকাশ করেছে নেত্র নিউজ (আর্কাইভ)। শাকিল ২৮ দিন কারাগারে ছিলেন। বগুড়ায় উপজেলা বিএনপির সভাপতি এনসিপির সাময়িক বহিষ্কৃত নেতা গাজী সালাহউদ্দিন তানভীরের বিরুদ্ধে মামলা করেন (আর্কাইভ) কারণ তানভীর প্রধানমন্ত্রীর বিষয়ে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। তাঁকে ৪১ দিন আটকে রাখা হয়। হেফাজতে তাঁর স্ট্রোক হয় এবং পরে তিনি নির্যাতনের অভিযোগ করেন।

কখনো দল অভিযোগ দায়েরের ধাপটিও এড়িয়ে যায়। শ্রীনগরে যুবদল সদস্যরা শাওন মাহমুদকে ধরে (আর্কাইভ) পুলিশের হাতে তুলে দেন। পুলিশ তাঁকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে অভিযুক্ত করে। ফেনীতে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক সদস্য জাইমা রহমানকে নিয়ে পোস্টের অভিযোগে মোসলেহ উদ্দিনকে পুলিশের হাতে তুলে দেন (আর্কাইভ)। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে পাথর ব্যবসায়ী জুবায়ের আহমদ ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘মন্ত্রী মহোদয় আমাদের জীবন কঠিন থেকে কঠিনতম করে দিলেন।’ স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা বিএনপির নেতারা তাঁকে ডেকে নিয়ে থানায় পুলিশের হাতে তুলে দেন; তবে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তা অস্বীকার করেছেন। সেদিন রাতেই মুচলেকা দিয়ে জুবায়েরকে বিএনপির এক নেতার জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।

সমালোচনার ঊর্ধ্বে যারা

এই গ্রেপ্তারগুলো যাঁদের সুরক্ষা দিচ্ছে, তাঁরা শুধু প্রধানমন্ত্রী নন বরং ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে বিস্তৃত। ফেব্রুয়ারি থেকে বিএনপি বা সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্যের কারণে গ্রেপ্তার বা মামলার শিকার ৫০ জনের মধ্যে শুধু ১৭ জন সরাসরি তারেক রহমানকে লক্ষ্য করেছিলেন। ২৫ জনের বক্তব্য ছিল মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য বা উপদেষ্টাদের নিয়ে। পাঁচজনের বক্তব্য ছিল প্রধানমন্ত্রীর পরিবারকে নিয়ে: চারটি তাঁর মেয়ে জাইমাকে নিয়ে, আর একটি তাঁর প্রয়াত মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে নিয়ে। বাকি ৩ জন অন্যান্য কারণে। বাগেরহাটে জাইমাকে নিয়ে পোস্টের অভিযোগে বিশেষ ক্ষমতা আইনে একজনকে আটক করে পুলিশ (আর্কাইভ)। রাঙামাটিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মেয়েকে নিয়ে পোস্টের কারণে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

অপরাধ না খুঁজে পেলে দেয়া হচ্ছে গায়েবী মামলা

কখনো কখনো বক্তব্যের সঙ্গে মেলানো যায় এমন কোনো আইন থাকে না। তখন পুলিশ পুরোনো মামলার আশ্রয় নেয়।

বিদ্যুৎ বিলের ভিডিওর জন্য সিফাত আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই আনা হয়নি। গাছা থানা তাঁকে জুনে আওয়ামী লীগের মশাল মিছিল নিয়ে করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় (আর্কাইভ)। ওই মামলায় তাঁর নাম ছিল না (আর্কাইভ)। তিন সপ্তাহ পর শ্রীপুরে পুলিশ বিদ্যুৎ বিল নিয়ে আরেকটি পোস্টের কারণে স্থানীয় এনসিপি সংগঠক আশরাফুল ইসলাম সজলকে গ্রেপ্তার করে (আর্কাইভ)। তাঁকেও আওয়ামী লীগের মিছিল নিয়ে করা মামলায় আসামি করা হয়। সিলেটে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডয়চে ভেলেকে (আর্কাইভ) বলেন, ২১ বছর বয়সী মেহেদী আহমদকে ২০২৪ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বিষয়ে তাঁর পোস্টও ‘একটি কারণ’ ছিল, কিন্তু সেটি নিয়ে কোনো মামলা হয়নি। মেহেরপুরে লোডশেডিং নিয়ে সঞ্জয় কুমার দাসের ভিডিও ছড়ানোর রাতেই তাঁকে তুলে নেওয়া হয়। পুলিশ দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় তাঁকে আটক রাখা হয়।

পুরোনো মামলায় আসামি করলে এমন কোনো অভিযোগ আনতে হয় না, যা আদালতে টিকবে না এবং মানুষটিকে কারাগারে রাখা যায়। বক্তব্যটিও থেকে যায় মামলার নথির বাইরে।

অন্তর্বর্তী সরকার যা করেছিল

হাসিনা আমলের বক্তব্য ঘিরে করা মামলাগুলো তুলে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আইন মন্ত্রণালয় ১,৩৪০টি বিচারাধীন ‘বক্তব্যজনিত অপরাধের’ মামলা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। ২০২৫ সালের আগস্টে তারা জানায়, ৪০৮টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে মুক্তিযুদ্ধ, শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় সংগীত বা পতাকা নিয়ে ‘বিদ্বেষ’ ছড়ানোর অপরাধ বাদ দেওয়া হয় (আর্কাইভ)। অভিযোগ কে করতে পারবেন, সে নিয়মও যুক্ত করা হয়। দ্য ঢাকার হিসাবে, ১৮ মাসে প্রধান উপদেষ্টা বা তাঁর সরকারের সমালোচনার অভিযোগে দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই বিএনপি নেতাদের অপমানের অভিযোগে গ্রেপ্তার শুরু হয়। ২০২৫ সালের মার্চ ও এপ্রিলে খালেদা জিয়াকে নিয়ে পোস্টের জন্য এক আওয়ামী লীগ কর্মীকে, আর এক ইমামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ; ইমামের মন্তব্যের বিষয়ে অভিযোগ করেছিলেন যুবদলের এক নেতা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শাহবাগে ওসমান হাদির কবরের কাছে তারেক রহমানকে ‘চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী’ বলে চিৎকার করায় বিএনপি কর্মীরা এক শিক্ষককে আটক করে (আর্কাইভ) পুলিশের হাতে দেন। পরবর্তীতে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে ওই ঘটনায় বিএনপিই তাঁর মুক্তি চেয়েছিল। এক মাস পর তারেক রহমানকে নিয়ে মন্তব্যের কারণে আরেকজনকে গ্রেপ্তারের নিন্দা জানায় আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আর্কাইভ)। সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিএনপি নেতাদের নিয়ে মন্তব্যের অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অধিকাংশ অভিযোগ এসেছিল দলের কর্মীদের কাছ থেকে; দলটি পুলিশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগে।

মাঝেমধ্যে হস্তক্ষেপ করেন প্রধানমন্ত্রী

৩০ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ায় বাংলা শিক্ষক গোলাম কিবরিয়া লালনকে আটক করে পুলিশ। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকায় প্রধানমন্ত্রীর বাংলায় প্রভাব পড়েছে—ক্লাসে এমন মন্তব্য করেছিলেন তিনি। এ নিয়ে অভিভাবকেরা প্রতিবাদ করেন। সেদিন রাতে প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, ঘটনাটি জেনে তারেক রহমান অসন্তুষ্ট হয়েছেন এবং শিক্ষককে সসম্মানে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লালনকে বাড়িতে পৌঁছে দেন। এপ্রিলে চিফ হুইপ সংসদে বলেন (আর্কাইভ), কেউ তাঁর কার্টুন আঁকার কারণে গ্রেপ্তার হয়ে থাকলে তিনি তাঁদের মুক্তি চান। ঠিক এমন একটি কার্টুন শেয়ার করা পেজের জন্য কারাগারে যাওয়া হাসান নাসিম ২১ এপ্রিল জামিন পান; পেজটি তিনি চালান না বলে দাবি করেছেন।

এই হস্তক্ষেপগুলো হয়েছে একেকটি মামলা ধরে। সরকারের বক্তব্য বদলায়নি। মুক্তাগাছার গ্রেপ্তারের পর প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব ডয়চে ভেলের কাছে প্রশ্ন তোলেন (আর্কাইভ), ‘মত প্রকাশ কি সীমাহীন?’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য রুহুল কবির রিজভী বিবিসি বাংলাকে (আর্কাইভ) বলেন, এমন পোস্ট ‘অবশ্যই আইনের আওতায় আসা উচিত’। কুষ্টিয়ার শিক্ষক বাড়ি যাওয়ার তিন সপ্তাহ পর আবু বকর সিদ্দিক রিমান্ডে ছিলেন। চার সপ্তাহ পর সাথী আক্তার কারাগারে।

এখন তাঁরা কোথায়

বেশির ভাগ মামলার খবর প্রথম দিনের পর আর থাকে না। আমাদের নথিতে থাকা অনেকের বিষয়ে শেষ খবরটিতে তাঁদের কারাগারে থাকার কথা বলা হয়েছে। পরে তাঁরা জামিন পেয়েছেন এমন কোনো প্রতিবেদন আমরা খুঁজে পাইনি।

স্বাধীন হিসাবেও একই চিত্র দেখা যায়। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি দুই বছরের একই ছয় মাসের তুলনা করেছে। তাদের হিসাবে (আর্কাইভ), ২০২৫ সালের মার্চ–আগস্টে সাইবার আইনে ১৫টি মামলা ও ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল; ২০২৬ সালের মার্চ–আগস্টে মামলা ছিল ৪১টি, গ্রেপ্তার ৬১ জন।

আবার ফিরে গেলাম?

মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার সরকারের সমালোচনার কারণে মানুষকে গ্রেপ্তার করা প্রায় বন্ধই করে দিয়েছিল। অভ্যাসটি অবশ্য একেবারে বিলুপ্ত হয় নি। বরং তা টিকে ছিল বিএনপির কারণেই — দল সরকারে আসার আগেই কর্মীরা নেতাদের অপমানের অভিযোগে মানুষকে পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছিলেন। ফেব্রুয়ারিতে দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। এরপর ওয়ার্ড সম্পাদক থেকে সংসদ সদস্য পর্যন্ত নেতারা পুলিশকে ব্যবহার করে প্রধানমন্ত্রীকে অপমান করাকে আবারও গ্রেপ্তারযোগ্য অপরাধে পরিণত করেছেন। আট মাসে সপ্তাহে প্রায় একবার করে গ্রেফতার হচ্ছে বাংলাদেশীরা। প্রধানমন্ত্রী একজন শিক্ষককে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন। কিন্তু তিনি গ্রেপ্তার বন্ধের নির্দেশ দেননি।