শেহরিজ আনাবিয়া মেহেরিন; বয়স মাত্র ছয় মাস। ২০২৫ সালের ১৮ই এপ্রিল রাতে চট্টগ্রামের কাপাসগোলায় একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা খোলা নালায় পড়ে গেলে তার মা ও নানিকে স্থানীয়রা উদ্ধার কাজ শুরু করে। কিন্তু শেহরিজকে সেখানে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাকে উদ্ধার করা হয় ১৪ ঘণ্টা পরে, পাঁচ কিলোমিটার দূরে চাক্তাই খালে — ময়লার স্তূপের নিচ থেকে। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা ছিল না। ২০২৪ সালের জুনে চট্টগ্রামের গোসাইলডাঙ্গায় সাত বছর বয়সী সাইদুল ইসলামও একটি নালায় পড়ে যায়। তার মৃতদেহ পরদিন নাসির খালে পাওয়া যায়। একই মাসে, পশ্চিম গোসাইলডাঙ্গার কাছে আট বছরের একটি শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার হয় একটি খাল থেকে — স্থানীয়রা জানায়, সিডিএ'র বা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় নির্মিত বক্স ড্রেনের একটি ঢাকনাহীন অংশের কাছে সে খেলছিল।
তাছাড়া খোলা নালার বাইরেও মৃত্যু হয়েছে । ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রাজশাহীর তানোরে দুই বছরের সাজিদ মাঠের মধ্যে তার মায়ের সাথে হাটতে গিয়ে একটি পরিত্যক্ত টিউবওয়েলের শ্যাফটে পড়ে যায়, যার মুখ ঢাকা ছিল শুধু খড়ের আঁটি দিয়ে। ৩২ ঘণ্টার উদ্ধার অভিযানের পর অক্সিজেনের অভাবে মৃত অবস্থায় তাকে বের করা হয়। ২০২৬ সালের ২৮শে জানুয়ারি, চট্টগ্রামের রাউজানে তিন বছরের মেজবাহ উদ্দিন একটি সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় চার বছর আগে খোঁড়া একটি টিউবওয়েল শ্যাফটে পড়ে যায় — যেটা কখনো সিলগালা করা হয়নি। উদ্ধার হয় তিন ঘণ্টা পরে, মৃত অবস্থায়।
এই ঘটনাগুলো নতুন নয়। ২০১৪ সালেও ২৬শে ডিসেম্বর ঢাকার শাহজাহানপুরে চার বছরের জিহাদ বন্ধুদের সাথে খেলতে গিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি পরিত্যক্ত টিউবওয়েলের পাইপে পড়ে মারা যাওয়ার ঘটনা দেশে ব্যাপক আলোড়নের জন্ম দিয়েছিলো।
চট্টগ্রামে ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে শুধু খাল ও নালায় পড়ে মারা গেছে কমপক্ষে ১৭ জন — এর মধ্যে অধিকাংশই শিশু। The Daily Star-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালে দুইজন, ২০২১ সালে পাঁচজন, ২০২৩ সালে তিনজন, ২০২৪ সালে তিনজন এবং ২০২৫ সালে আরও দুইজন এভাবে মারা গেছেন। প্রতিটি মৃত্যুর পরেই একটি তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে। প্রতিটি কমিটি একটি রিপোর্ট দিয়েছে। এবং পরের বর্ষায় আবার একই ঘটনা ঘটেছে।
এই ঘটনাগুলো বারবার কেন ঘটে?
ম্যানহোলের ঢাকনাগুলো না থাকার অন্যতম একটি কারণ হলো মূলত চুরি। ম্যানহোলের ঢাকনাগুলো মূলত লোহার তৈরি যা বাজারে পরবর্তীতে উচ্চমূল্যে রিসেল করা যায়। লোহার হাই রিসেল ভ্যালুর কারণেই ম্যানহোলের ঢাকনা নিয়মিত চুরি হয়ে থাকে। এর বিপরীতে স্থানীয় সরকার কর্তৃক স্বপ্রণোদিত কোনো উদ্যোগ এখন পর্যন্ত দেখা যায় নি। কোনো ধরণের চুরি ঠেকানোর প্রক্রিয়া কিংবা লো রিসেল ভ্যালু আছে এমন ম্যাটেরিয়ালে শিফট হওয়ার কোনো ইচ্ছাও স্থানীয় সরকারের মধ্যে দেখা যায় না। এর পাশাপাশি চট্টগ্রামের মতো জেলাগুলোতে যেখানে জলাবদ্ধতার সমস্যা প্রকট সেখানে সাধারণ মানুষের মধ্যে পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার জন্য ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে ফেলার মতো আচরণ দেখা যায়। ফলে বর্ষা ঋতুর মতো সময়ে যখন ব্যাপক জলাবদ্ধতা হয় এই ম্যানহোলগুলো অদৃশ্য মৃত্যুকূপ হিসেবে কাজ করে। ঢাকা, গাজীপুর এবং বিশেষত চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে গত কয়েক মাসে বর্ষার সময় এই কারণে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটার তথ্য পাওয়া যায়। সমীর জালাদাস, যিনি চট্টগ্রামের বদ্দারহাট এলাকার একজন স্থানীয় বাসিন্দা তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, "আমরা জলাবদ্ধতার সময় সর্বদা আতঙ্কিত থাকি।" একই রিপোর্টে দেখা যায় চট্টগ্রাম শহর জুড়ে রাস্তার দুই ধারে বড় প্রস্থের ড্রেন খুঁড়ে রাখা হয়েছে যার কাজ শেষ না হওয়ায় মানুষ বিভিন্ন ছোটখাটো সাঁকোর মতো বাঁশ বা কাঠ দিয়ে নিজের বাসার গেট থেকে মেইন রোডে পৌঁছাচ্ছে। জলাবদ্ধতার সময় এই সাঁকোগুলো আর দেখা যায় না। তখনই মানুষ নিজের বাসায় যাওয়ার পথে ভুল করে বসে। রিপোর্টে আরও দেখানো হয় চট্টগ্রামের চশমা খালে একইভাবে অসংখ্য দুর্ঘটনা হওয়ার পরেও তা উন্মুক্ত অবস্থায় খুলে রাখা হয়েছে যা দিন দিন মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করছে। এছাড়াও দেশে ড্রেনেজ সিস্টেমগুলোর কাজ করতে সরকার থেকে একই প্রজেক্ট ভাগ করে একাধিক ঠিকাদারকে দেওয়া হয়। ফলে ঠিকাদারদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখা দেয় এবং দেখা যায় একই এলাকায় কিছু অংশে এক ঠিকাদার কাজ করলেও অন্য অংশে অন্য ঠিকাদার কাজ শুরুই করেন নি। সমন্বয়ের অভাবে প্রায় ক্ষেত্রে সময় মতো কাজ শেষ করা যায় না।
দুর্ঘটনাগুলোর জন্য আসলে দায়ী কারা এবং কেন কেউ এর সমাধান করেন না?
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এর তথ্যসূত্রে ২০১৭ থেকে ২০২৫ এর মধ্যে কমপক্ষে ১৭ জন এই ধরণের দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন। জাদের অধিকাংশই শিশু।
১. মেজবাহ উদ্দীন - বয়স ৩ বছর
২. মোছা: হুমায়রা - বয়স ৩ বছর
৩. সাইদুল ইসলাম - বয়স ৭ বছর
৪. কামাল - বয়স ১২ বছর
৫. জসিম উদ্দীন - বয়স ৭ বছর
৬. আব্দুল - বয়স ৬ বছর
৭. শেহরিজ আনাবিয়া মেহেরিন - বয়স ৬ মাস
৮. আল আমিন - বয়স ৭ বছর
৯. ইয়াসিন আরাফাত - বয়স ১৮ মাস
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এর ২০২১ সালের সার্ভে অনুসারে চট্টগ্রামে ১,১৩৭ কিলোমিটারের ক্যানাল ও ড্রেইন আছে। যার মধ্যে প্রায় ১৯ কিলোমিটার অঞ্চল এ সেফটি রেলিং নেই ও ৫,৫২৭ টি অঞ্চল এ উন্মুক্ত ড্রেইন রয়েছে। ঢাকা ওয়াসার একক ভাবেই ৩৫০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে প্রায় ৪১০০০ ম্যানহোল আছে। দুই সিটি কর্পোরেশনের আরও ৩৩,০০০ এর মতো ম্যানহোল আছে। এদের মধ্যে অসংখ্য ম্যানহোল প্রায় সময় উন্মুক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। গাজীপুরে বোর্ড বাজার থেকে টঙ্গী হোসেন মার্কেট পর্যন্ত মাত্র ৪ কিলোমিটার এলাকায় কমপক্ষে ২৫ টি ড্রেন ও ম্যানহোল উন্মুক্ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে। অর্থাৎ ম্যানহোলের সংখ্যা ডকুমেন্টেড এবং স্থানীয় সরকার চাইলেই উদ্যোগ নিয়ে এগুলো সমাধান করতে পারে। ম্যানহোলে পড়ে মারা যাওয়ার ঘটনা তাদের অজানা নয়। তাহলে স্থানীয় সরকার কর্তৃক এর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না কেন? এখানেই দেখা যায় একাধিক কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভাব ও একে অন্যকে দোষী সাব্যস্ত করার প্রচেষ্টা।
শুধু চট্টগ্রাম শহরেই ড্রেনেজ ব্যবস্থা তিনটি সংস্থার ওপর ন্যস্ত। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (CDA) ও চট্টগ্রাম ওয়াসা। উক্ত সংস্থা গুলোর মধ্যকার সমন্বয়হীনতাই চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ড্রেনেজ প্রজেক্ট এতো বছরেও সমাপ্ত না হওয়ার প্রধান কারণ। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো ২০২১ সালে ড্রেনে পড়ে একজন মারা যাওয়ার পর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বলেন তারা এখানে ওয়াল নির্মাণ করতে পারছেন না কেননা সিডিএ বা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এখানে কাজ করছে। অন্যদিকে সিডিএ-ও এই দুর্ঘটনার দায় অস্বীকার করে।
যেকোনো দুর্ঘটনার পর-ই তদন্ত কমিটি করার রেওয়াজ নতুন নয়। কিন্তু এই তদন্ত কমিটিগুলো কি আসলেই কার্যকরী? ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তিন বছর বয়সী হুমায়রা মারা যাওয়ার পর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন একটি তদন্ত কমিটি করে এবং একদিনের মধ্যে সেই তদন্ত কমিটি রিপোর্ট দেন হুমায়রার মৃত্যুতে মূলত তার পরিবারের গাফিলতিই আসল কারণ।তারা দাবি করেন ড্রেনগুলো ব্যক্তিগত সম্পত্তির ভিতরে অবস্থিত। তদন্ত কমিটির সাথে যুক্ত হয়ে তৎকালীন সিটি কর্পোরেশন মেয়র ও বলেন এই দুর্ঘটনায় সিটি কর্পোরেশনকে দায় দেওয়া নীতিগত ভাবে অনৈতিক। একইভাবে বেশিরভাগ দুর্ঘটনার তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা যায় সকল কমিটিই কিছু পরিমাণে ভিক্টিম ব্লেমিং ও নীতিগত পরামর্শ দেওয়া ব্যতীত ড্রেনেজ বা ম্যানহোলের ঢাকনা উন্মুক্ত থাকার জন্য আসলে কে দায়ী তা নিয়ে কোনো আলাপ থাকেনা। ড্রেনে রিকশা পড়ে শেরিজের মৃত্যুর পর তদন্ত কমিটি রিকশাওয়ালাকে দোষ দেওয়ার পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের সমন্বয়হীনতাকে কারণ দেখিয়ে ৩৪টি পরামর্শ দিয়ে রিপোর্ট সমাপ্ত করেন।
আরেকটি দিক হলো সরকার কর্তৃক হাজার কোটি টাকা ব্যয় করার পরেও উক্ত সমস্যা গুলোর কোনো সমাধান হচ্ছে না। ২০২৩ সালে একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে দেখা যায় গত ৬ বছরে কেবল চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমাধানে ৫৭৯০ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। কিন্তু এই টাকায় যেই ৪০টি স্লুইস গেট বানানোর কথা তন্মধ্যে কেবল মাত্র ৫টির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ১১,৩৪৪ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প হাতে নিয়ে ২০২৩ সালে জলাবদ্ধতা কম হবে বললেও ২০২৩ সালের ৭ মাসেই ১০ বার জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। অন্যদিকে ২০২৪ সালের টিআইবি (TIB) এর রিপোর্টে দেখা যায় গত ১৫ বছরে সড়ক উন্নয়ন খাতে ৫০,০০০ কোটি টাকা দুর্নীতি হয় এবং প্রায় ৪০% অর্থই ভুল জায়গায় বরাদ্দ করা হয়।
এছাড়াও সড়কের এই ধরণের অব্যবস্থাপনার ফলে মৃত্যু বা আঘাত প্রাপ্ত হলেও আইনি সহায়তা নেওয়ার কোনো উপায় থাকে না। বাংলাদেশের সংবিধানে একজন নাগরিক এই ধরণের দুর্ঘটনার সম্মুখ হলে কি করতে পারবেন তা নিয়ে স্পষ্ট ভাবে কিছু বলা নেই। Road Transport Act 2018 তে সড়ক দুর্ঘটনার ফলে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হলেও সড়কে নির্মাণাধীন কোন প্রকল্পের অব্যবস্থাপনায় কেউ ক্ষতিগ্রস্থ হলে তিনি কী করতে পারবেন তা বলা নেই। ফলে অনেকসময় পরিবার গুলোর একমাত্র উপার্জনক্ষম কোনো ব্যক্তিও যদি কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনায় ক্ষতির সম্মুখীন হন, তাদের করার কিছুই থাকে না।
প্রতি বছরই বর্ষার পূর্বে কর্তৃপক্ষ থেকে আশাবাদী বক্তব্য দেন কর্তৃপক্ষ।তবে চট্টগ্রামে এখনো শত শত খোলা নালা আছে। ঢাকা কিংবা গাজীপুরেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের প্রশ্নটা উঠে: নিরাপদ রাস্তা পাওয়া কি বাংলাদেশে নাগরিক অধিকার, নাকি এটা এখনো ভাগ্যের বিষয়?
