"ঢাকার মালিকেরা অনুমতি দিলে ঢাকায় ফিরতে চাই।" গত ঈদের ছুটি শেষে মানুষ যখন নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করে তখন এটি ছিলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গুলোর অন্যতম আলোচ্য একটি বিষয়। প্রতিবছরই ঈদের সময় ঢাকা জনশুন্য হয়ে পড়া নিয়ে ঢাকায় ঈদ উদযাপন ও ঢাকার বাইরে ঈদ উদযাপন করা ব্যক্তিদের মধ্যে নানারকম যুক্তিতর্ক হতে দেখা যায়।
তবে ঢাকাইয়া পরিচয় নিজেই একটি তর্ক সাপেক্ষ বিষয়। মুঘল আমলে ঢাকা বলতে মূলত বর্তমান পুরান ঢাকাকেই বোঝাতো। ব্রিটিশ আমল সমাপ্তির পর ঢাকায় ধীরে ধীরে অন্যান্য অঞ্চল থেকে আসা মানুষ বাড়তে থাকে এবং ঢাকার পরিধিও পুরান ঢাকা ছাড়িয়ে আরো অনেক বিস্তৃতি লাভ করে। স্বাধীনতার পূর্বে ঢাকায় মাইগ্রেট করা এই জনগোষ্ঠীর পরবর্তীতে এমন এক প্রজন্ম তৈরি করে যাদের বেড়ে ওঠা ঢাকায় এবং পুরান ঢাকার বাইরে ঢাকার নতুন অঞ্চল গুলোতে। ঢাকার বিস্তৃতির পাশাপাশি নতুন এই প্রজন্ম নিজেদের ঢাকাইয়া বলে দাবি করতে শুরু করলে তৈরি হয় ঢাকাইয়া পরিচয় নিয়ে প্রথম বিরোধ। ঢাকাইয়া আসলে কারা? বংশ পরিক্রমায় বহু বছর ধরে ঢাকায় বসবাস করা পুরান ঢাকার কুট্টি বাঙালিরা নাকি নতুন নির্মিত ঢাকা শহরে বেড়ে ওঠা সেকেন্ড জেনারেশন ইন্টারনাল মাইগ্র্যান্টসরা? এই বিরোধের কারণেই পুরান ঢাকার কুট্টি বাঙালিরা নিজেদের আলাদা করে পুরান ঢাকাইয়া বলে দাবি করতে শুরু করেন, অন্যদিকে ঢাকাইয়া পরিচয় একটি তর্কসাপেক্ষ বিষয় হয়ে দাঁড়ায় কারণ এর ব্যবহারে বংশগত ঢাকাই আবাসস্থলের পরিবর্তে মাইগ্রেশনের ওপর ঢাকাইয়া পরিচয় বেড়ে উঠতে শুরু করে।
এই মাইগ্রেশন এর ভিত্তিতে ঢাকা কেন্দ্রিক পরিচয় থেকেই শুরু হয় আরেক ধরনের বিতর্ক। বাংলাদেশ দিন দিন ঢাকা কেন্দ্রিক দেশে পরিণত হওয়ায় ঢাকায় প্রচুর পরিমাণে দেশি বিদেশি বিনিয়োগ আসতে থাকে। ফলে পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় চাকরি পেতে হলে মানুষকে ঢাকায় আসতে হবে। বাংলাদেশ আরবান হেলথ সার্ভে ২০১৩ এ দেখা যায় ৮৫.৩% পুরুষ ঢাকায় মাইগ্রেট করেন কাজের উদ্দেশ্যে। ৬৪.৮% নারী ঢাকায় মাইগ্রেট করেন মূলত পরিবারের কারণে। এই নতুন ফার্স্ট জেনারেশন মাইগ্র্যান্টরা নিজের জন্মগত আবাসস্থলের সাথে গভীর সম্পর্ক রাখেন। ঈদসহ অন্যান্য ছুটিতে গ্রামে নিয়মিত ঘুরতে যাওয়ার পাশাপাশি নিজেদের ভোটাধিকারসহ সকল ডকুমেন্টেশনে তারা নিজেদের আগের আবাসস্থলকেই ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এর ফলে দেখা যায় তাদের সন্তানাদি ঢাকায় বড় হলেও পরিবার থেকে তারা সব সময় এমন এক জায়গা কে নিজের আসল ঠিকানা হিসেবে জেনে বড় হন যেখানে তারা কখনোই ঘুরতে যাওয়া ব্যতীত থাকার সুযোগ পাননি বা যেখানকার মানুষদের সাথে তারা ভালো করে মিশবার সুযোগ ও কখনো পাননি। জন্ম থেকেই ইমোশনালি ঢাকাকে পর ভাবার কারণে অধিকাংশ মানুষ সমগ্র জীবন ঢাকায় কাটালেও ঢাকা কে কখনো নিজের চিরস্থায়ী ঠিকানা হিসেবে কল্পনা করে উঠতে পারেন না। তাদের মধ্যে সর্বদাই ঢাকা এবং নিজের পৈতৃক নিবাসের মধ্যে কোনটি তার আসল ঠিকানা তা নিয়ে দ্বিধা দ্বন্দ্ব কাজ করে।
ঢাকার আরেকটি সমস্যা হলো এই শহরের বেশিরভাগ বাসিন্দাই এখানকার ভোটার নন। বাংলাদেশ এর ভোটারদের নিজের ভোটিং আসন পরিবর্তন করা অত্যন্ত দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য একটি প্রক্রিয়া। দৈনন্দিন কাজের পাশাপাশি গিয়ে আপনি সময় করে নিজের ভোটার আসন নিজের গ্রাম থেকে ঢাকায় পরিবর্তন করবেন তা প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। ফলে বেশিরভাগ মানুষই নিজের ভোটার অধিকার চর্চা করতে পারেন না। এটি আর শুধু তত্ত্ব নয় — গত মাসের নির্বাচনে এটি প্রমাণিত হয়েছে। সারা দেশে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ, কিন্তু ঢাকায় তা ছিল মাত্র ৪৫ শতাংশের কাছাকাছি। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে দেখা যায় ঢাকার ২০টি আসনে মোট নিবন্ধিত ভোটার ছিলেন ৮৪.৫ লাখ — অথচ শহরের প্রকৃত জনসংখ্যা ২.২৪ কোটি। এই ব্যবধান কোনো কাকতালীয় নয়। তারা ঢাকায় থাকলেও ভোট দেন অন্য জেলায়। তাই দেখা যায় নির্বাচনে যাদের সমস্যা সমাধান করতে প্রতিনিধি নির্বাচন করার কথা তারা কখনো ভোটই দিতে পারেননা এবং তাদের সাধারণ সমস্যাগুলোও জনপ্রতিনিধিরা সেভাবে উদ্যোগ নিয়ে সমাধান করেন না।
অধিকন্তু ঢাকার ইনফ্রাস্ট্রাকচার তার মাইগ্র্যান্ট দের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে আনওয়েলকামিং। ঢাকা শহরের যেকোনো এলাকাতেই সাধারণ সুযোগ সুবিধা সমূহের প্রাপ্তি নির্ভর করে প্রতিটি মানুষের আর্থিক অবস্থার ওপর। ঢাকা শহরে যাদের নিজস্ব বাড়ি নেই তারা সবাই কমবেশি এই সমস্যা গুলো ভোগ করে থাকেন। দ্য গার্ডিয়ানের ২০১৫ সালে প্রকাশিত তথ্যমতে বাহির থেকে প্রতিবছর ৪-৫ লাখ মানুষ ঢাকায় মাইগ্রেট করেন। এখানে প্রচুর পরিমাণে এমন মানুষ থাকেন যারা ঢাকা শহরের বস্তি গুলোতে গিয়ে উঠেন। বস্তি গুলোতে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা থেকে শুরু করে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ কোনো সুবিধাই তারা পান না। পাশাপাশি তাদের কর্মস্থল যেমন রিকশা চালানো, হকারি কিংবা স্ট্রিট ফুড কার্টগুলোতে প্রায় সময়ই বিনা নোটিশে অভিযান চালিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রশাসন থেকে এই ধরনের আচরণও তাদের ঢাকা কে শুধু জীবিকার তাগিদে থেকে যাওয়া একটা জায়গা হিসেবেই চিন্তা করতে বাধ্য করে।

এর পাশাপাশি যারা ভাড়া বাসা গুলোতে থাকেন তারাও নানা ধরনের সমস্যায় পড়েন। ঢাকা বাংলাদেশের একমাত্র কর্মক্ষেত্র হয়ে ওঠার কারণে দিন দিন ঢাকার রিয়েল এস্টেট ব্যবসা অগ্রগতি লাভ করেছে। Bangladesh Bureau of Statistics (BBS) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ঢাকায় বাড়িভাড়া বেড়েছে ২৮.৫৩ শতাংশ — গড়ে প্রতিবছর ৫.৭১ শতাংশ হারে। উল্লেখযোগ্যভাবে, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য এই বৃদ্ধির হার উচ্চবিত্তের তুলনায় বেশি। কিন্তু যারা এখানে ভাড়া নিয়ে থাকেন তাদের আয় সেভাবে বাড়েনি। তাই এই মানুষগুলোকে নিজের নিম্ন আয় দিয়েই পরিশোধ করতে হয় উচ্চমূল্যের মাসিক ভাড়া। উদাহরণস্বরূপ লালবাগ এর একটি তিন রুমের ফ্ল্যাটের ভাড়া ২০২৩ সালে ছিল ২১,৬০০ টাকা, কিন্তু ২,০০০ টাকা বাড়ানোর পর ভাড়াটেরা বাধ্য হয়ে ছোট ফ্ল্যাটে চলে যান। যা তাদের এই শহরে জীবন যাপন অত্যধিক কষ্ট সাধ্য করে তোলে।
অনেকে যুক্তি দেন যে এই দ্বৈত পরিচয় আসলে সমস্যা নয়, বরং এটি মাইগ্র্যান্টদের একটি কার্যকর টিকে থাকার কৌশল। এদিকে দ্য ডেইলি স্টারের প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে দেখানো হয় যে ঢাকায় আসা মাইগ্র্যান্টরা নিজেদের জেলাভিত্তিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে কাজ খুঁজে পান, বাসস্থান পান এবং অপরিচিত শহরে নিজেদের জায়গা করে নেন। এই "ট্রান্সলোকাল সামাজিক পুঁজি" তাদের দুই জায়গায় একসাথে সক্রিয় থাকতে সাহায্য করে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে গ্রামের সাথে সম্পর্ক রাখা দুর্বলতা নয় — এটি একটি যৌক্তিক সোশ্যাল সিকিউরিটি।
কিন্তু এই যুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য এড়িয়ে যায় — একজন মানুষ দুই জায়গায় টিকে থাকার কৌশল হিসেবে দ্বৈত পরিচয় রাখতে পারেন, কিন্তু সেটা তার নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে না। ঢাকায় থেকেও ঢাকার রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে অংশ নিতে না পারাটা ব্যক্তিগত পছন্দ নয় — এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা।
পরিশেষে ঢাকা দিন দিন এমন এক শহর হয়ে উঠছে যেখানে তার বেশিরভাগ বাসিন্দাই কেবল জীবিকার তাগিদে এখানে অবস্থান করেন। তাই ঈদ এর মতো ছুটি গুলোতে আমরা ঢাকাকে জনমানবহীন হয়ে পড়তে দেখি। ঢাকার এই সমস্যা শুধু অবকাঠামোর নয়, এটি রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের স্বীকৃতির প্রশ্ন। যে শহর মানুষের শ্রম নেয়, কর নেয়, কিন্তু তাদের রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর নিশ্চিত করে না — সেই শহর কি আসলে তাদের শহর? ঢাকার মাইগ্র্যান্টদের নাগরিক অন্তর্ভুক্তির জন্য কি ভোটার নিবন্ধন সংস্কারই যথেষ্ট, নাকি এর জন্য প্রয়োজন বিভাগীয় শহরগুলোতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে ঢাকামুখী মাইগ্রেশনের চাপটাই কমানো?
